মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস - মুক্তিযুদ্ধের তাৎপর্য - পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ

বাংলাদেশের 'মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস' সম্পর্কে আমাদের ছোট বড় প্রায় প্রত্যেকেরই মৌলিক জ্ঞান থাকলেও, হয়তো আমাদের মধ্যে অনেকেরই মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস বা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান অনেকেরই নেই। আজকে তাই এই পোষ্টের মধ্যে আপনাদেরকে জানাবো মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস । আসুন তবে শুরু করা যাক মুক্তিযুদ্ধের আসল সঠিক এবং মুক্তিযুদ্ধ কিভাবে পরিচালনা করা হয়েছিল।

পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে  জায়গা করে নিতে এবং দেশের একটি নিজস্ব পতাকা যেটি একটি জাতি বা পরিচয় সেটি অর্জন রাতারাতি হয়নি। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র পেতে আমাদেরকে করতে হয়েছে অনেক সাধনা। প্রায় ২ কোটি মা বোনদের সম্মান এবং প্রায় ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে নয় মাস মুক্তিযুদ্ধের পরে অর্জিত হয়েছে আমাদের এই স্বাধীনতা। আজকে এই পোষ্টের মাধ্যমে আপনাদেরকে জানাবো কিভাবে পাকিস্তানিদের শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন বাঙালিদের মুক্তিযুদ্ধে বা স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপান্তরিত হলো

সূচিপত্রঃ মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস- মুক্তিযুদ্ধের তাৎপর্য - পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ

মুক্তিযুদ্ধের তাৎপর্য

মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানার মাধ্যমে আমরা জানতে পারবো এই মুক্তিযুদ্ধের তাৎপর্য সম্পর্ক। পাকিস্তানিদের অমানবিক নির্যাতনের বিপক্ষে ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার যুদ্ধ। এই যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা প্রায় ২৪ বছরের অমানবিক নিপীড়ন -নির্যাতন, ও শাসন শোষণের হাত থেকে মুক্তি লাভ করি, আর এই কারণে মুক্তির এই লড়াইকে বলা হয় মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানার মাধ্যমে আমরা জানতে পারবো এই যুদ্ধে তাৎপর্য । মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে আমরা অর্জন করেছি বাংলাদেশ নামের এই স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রটি। এই মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পৃথিবীর মানচিত্রে আমরা জায়গা করে নিতে পেরেছি এবং পেয়েছি  বিশ্বে নিজেদের  পরিচয় তুলে ধরার মতন একটি জাতীয় পতাকা।

মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস বা পটভূমি

ব্রিটিশদের শাসনের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ভাষা ও সংস্কৃতি সহ অনেক বিষয়ে অমিল থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র ধর্মীয় মিলের কারণে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানের একটি প্রদেশ বা অংশ করা হয়। কিন্তু ব্রিটিশদের হাত থেকে স্বাধীন হওয়ার পরেও পূর্ব বাংলার জনগণ কখনোই মুক্তির স্বাদ নিতে পারেনি, আরেকটি ভিনদেশী শাসকের দ্বারা শোষিত হতেই থেকেছে।

১৯৭০ সালে সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু পাকিস্তানিরা বিজয়ী আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করেই পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ষড়যন্ত্র শুরু করে। ক্ষমতা হস্তান্ত না করার র জন্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বারবার ঠকিত ঘোষণা করা হয়। এমন অবস্থায় আওয়ামী লীগের সভাপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের মার্চের শুরু থেকে অসহযোগ আন্দোলন এবং ৭ই মার্চ ' ঘরে ঘরে দুর্গ 'গড়ে তোলার ডাক দেন। সেদিন থেকেই শুরু হয় বাঙালির স্বাধীনতার প্রস্তুতি বা মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর ক্ষমতা গ্রহণের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে আর অন্যদিকে তৎকালীন পাকিস্তানি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো তা বাঞ্চালের জন্য ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে ষড়যন্ত্র  শুরু করেন। ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বন্টনের ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানের রাজনীতিতে নতুন সংকট তৈরি করে। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে নির্বাচনে বিজয়ী দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবিতে  বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে এবং এই কর্মসূচিতে পূর্ব বাংলার জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয়। বিশেষ করে পূর্ব বাংলার ছাত্রদের ভূমিকা ছিল অবর্ণনীয়। এছাড়াও শিক্ষক পেশাজীবী ও মহিলা সংগঠনগুলো এই কর্মসূচিতে যোগদানের জন্য এগিয়ে আসে।

৭১ এর মার্চের শুরু থেকে প্রতিদিনের সমাবেশে প্রচুর লোকজনের সমাগম গড়তে থাকে। ভুট্টার সাথে ষড়যন্ত্রে যুক্ত হয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পহেলা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করায় আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ফলে ওই দিন আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারি কমিটির বৈঠকে সর্বাত্মক আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। শুরু হয় বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের আরেক অধ্যায় অসহযোগ আন্দোলন।

আরো পড়ুনঃ ২৬ শে মার্চ এ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ।

আওয়ামীলীগ ১৯৭১ সালের ২রা মার্চ ঢাকা শহরে এবং ৩রা মার্চ সারাদেশে হরতাল পালন করা হয়। ২রা মার সকাল ১১ টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বিশাল সমাবেশে ছাত্রলীগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নেতৃবৃন্দ দেশের মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। দেশের মানুষের জন্য প্রেরণা।

 ৩রা মার্চ থেকে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন এবং গঠিত হয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। এ পরিস্থিতিতে ইয়াহিয়া খান ৬ই মার্চ এক বেতার ভাষণে ২৫ শে মার্চ ঢাকায় পুনরায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের আহ্বান করেন। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সে ঘোষণায় সন্তুষ্ট হতে পারেনি। এ পরিস্থিতিতে ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণার জন্য আওয়ামী লীগ জনসভার আয়োজন করে।

মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি

মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানার জন্য আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানা দরকার।১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু তার ৭ই মার্চের ভাষণে বিজয়ী দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নির্দেশ পরিচালনার ঘোষণা দেন। জনগণের প্রতি পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে সর্বাত্মক ও সহযোগিতার নিয়ে তিনি তার ভাষণে কোট কাচারি , অফিস , শিক্ষা প্রতিষ্ঠান , অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেন। তিনি তার ভাষনে আরো বলেন " যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হচ্ছে, বন্ধ করে দেওয়া হলো"।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের পহেলা মার্চ থেকে ইয়াহিয়া খান ও তার সহযোগী জুলফিকার আলী ভুট্টোর কর্মকাণ্ড দেখে বুঝেছিলেন এরা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। তাই তিনি একদিকে আলোচনা ও অন্যদিকে চূড়ান্ত সংগ্রাম এবং ট্যাগের মাধ্যমে স্বাধীনতার জন্য জাতিকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান। প্রয়োজনে যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য তিনি বলেন " প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায়, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গড়ে তোলে এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো"।

আরো পড়ুনঃ ২৬ শে মার্চ কে কেন স্বাধীনতা দিবস বলা হয়

তিনি আরো বলেন " প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল।তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রু মোকাবেলা করতে হবে"। লক্ষ লোকের উপস্থিতিতে তিনি তারে বক্তব্যে ' বাংলাদেশ' শব্দটি ব্যবহার করে ভবিষ্যতে নতুন রাষ্ট্রের নামকরণ চূড়ান্ত করেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে বাঙ্গালীকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা। বক্তব্যের শেষ অংশে তিনি বলেন " এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম"। এই ঘোষণার মধ্যে দিয়ে তিনি স্পষ্টভাবে স্বাধীনতার এবং মুক্তিযুদ্ধের ডাক দেন।


বঙ্গবন্ধুর সেদিনের এই ভাষণ যেন জাদুর স্পর্শের মতন বাঙালি জাতিকে বীরের জাতিতে রূপান্তরিত করেছিল । এ ভাষণের নির্দেশনা অনুযায়ী ঐক্যবদ্ধ জনগণ অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নেই এবং মুক্তির সংগ্রামের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা অনুযায়ী দেশের সকল স্কুল - কলেজ, অফিস আদালত , কলকারখানা সবকিছু বন্ধ করে দেয়া হয়। পূর্ব পাকিস্তানের বিক্ষুব্ধ জনতা পাকিস্তানি বাহিনীকে বিভিন্ন স্থানে প্রতিরোধ করতে থাকে।

গভর্নরের হাউস , সেনানিবাস কিংবা সচিবালয় থেকে নয় , সেদিন বাংলাদেশ পরিচালিত হয়েছিল ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বঙ্গবন্ধুর বাড়ি থেকে। অবস্থা উপলব্ধি করে ইয়াহিয়া খান ১৫ ই মার্চ ঢাকা সফরে আসেন এবং বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনা প্রস্তাব দেন। ১৬ ই মার্চ থেকে আলোচনা শুরু হয়। বাইশে মার্চ জুলফিকার আলী ভুট্টো আলোচনায় অংশ  নেন। আলোচনায় ব্যর্থ হয়ে বাঙ্গালীদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে ২৫ শে মার্চ রাতে ইয়াহিয়া খান করেন। আর ওই দিনের মধ্যে রাতে বাঙালিদের ওপর চরম অত্যাচার আঘাত হানে ।ওই কালো রাতে পাকিস্তানের সেনারা অসংখ্য বাঙালি কে নির্বিচারে হত্যা করে।

২৫ শে মার্চের সেই ঘটনার পর ২৬ শে মার্চের প্রথম প্রহরের বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ২৬ শে মার্চের বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার পর থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একটি বাস্তব রূপ লাভ করতে শুরু করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক প্রস্তুতি বিক্ষিপ্তভাবে শুরু হলেও ক্রমান্বয়ে এটি একটি গণযুদ্ধে রূপ নেয়। এ দেশের সর্বস্তরের মানুষ কৃষক , শ্রমিক , ছাত্র ,যুবকদের সঙ্গে সেনাবাহিনী,পুলিশ, ইপিআর ও আনসারে কর্মরত বাঙালিরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে যুদ্ধে অংশ নেন । তখন থেকেই শুরু হয় নয় মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ।

স্থায়ী সরকার গঠন

মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল। বাংলাদেশ সরকার, আবার কখনো প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারও বলা হত, তবে এটি মুজিবনগর সরকার নামে বেশি পরিচিত ছিল। এ সরকারের নেতৃত্বেই মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত ও পরিচালিত হয়।

১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার বা বাংলাদেশ সরকার। ওই দিন মন্ত্রিসভায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ২৬ শে মার্চ ভূষিত স্বাধীনতা ঘোষণা অনুমোদন করা হয়। তবে মুজিবনগর সরকার স্বপনগ্রহণ করেন ১৯৭১ সালের ১৭ ই এপ্রিল ।শপথ বাক্য পাঠ করান অধ্যাপক ইউসুফ আলী।আওয়ামী লীগ সভাপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি (পদাধিকার বলে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ।

মুক্তিযুদ্ধে বিরোধী শক্তির সৎপরতা ও ভূমিকা

সেই সময় বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে সাত কোটি মানুষ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল। তবে এদেশের মানুষের একটি ক্ষুদ্র অংশ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে ও দেশবাসীর স্বার্থের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে। তারা পাকিস্তানি বাহিনীকে বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতাও করে। পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার নামে ও ধর্মের দোহাই দিয়ে এই স্বাধীনতা বিরোধীরা পাকিস্তানের সৈন্যদের সঙ্গে মিলে হত্যা, লু্‌ট, নারী নির্যাতন, অগ্নিকাণ্ড, সহ সারা দেশের ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। 

মুক্তিযুদ্ধের অংশগ্রহণকারী বাঙ্গালীদের খুঁজে বের করে তাদের নামের তালিকা এবং ঠিকানা বাঙ্গালীদের হাতে তুলে দেয়। তাদের অত্যাচার কখনো কখনো পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচারকে ছাড়িয়ে যেত। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর নির্দেশে গড়ে উঠেছিল তাদের বেশ কয়েকটি সহযোগী সংগঠন। হল এই সংগঠনগুলোর মাধ্যমে তারা এদেশের নিরীহ নিরস্ত্র মানুষের উপরে অত্যাচার চালাত। এবং মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা বের করত। পাকিস্তানদের সেই সহযোগী সংগঠনগুলো হল,

  • শান্তি কমিটি
  • রাজাকার
  • আল বদর
  • আল শামস
  • ড. মালিক মন্ত্রিসভা

যৌথ বাহিনীর নেতৃত্বে চূড়ান্ত যুদ্ধ

মুজিবনগর সরকারের সেক্টর ভিত্তিক যুদ্ধ পরিকল্পনার ফলে একাত্তরের মে মাস থেকে মুক্তিযোদ্ধারা সাহসের সাথে পাকিস্তানি বাহিনীর মোকাবিলা শুরু করে। জুন মাস থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাঙালি গেরিলা যোদ্ধারা দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে পাকিস্তানি বাহিনীর উপর ব্যাপক আক্রমণ চালাতে থাকে। ইতি পাকিস্তানি বাহিনীর দিশেহারা হয়ে পড়ে। মূলত মধ্য নভেম্বর থেকে ভারতীয় বাহিনী পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনীকে সম্মুখ যুদ্ধে সহায়তা দিতে শুরু করে ।

১৩ই নভেম্বর ট্যাংকসহ দুই ব্যাটেলিয়ান ভারতীয় সৈন্য যশোরে ঘাঁটি স্থাপন করে। পাকিস্তানি বাহিনীর উপর আরো সুদৃঢ় ভাবে আক্রমণের জন্য একুশে নভেম্বর বাংলাদেশ ও ভারত সরকার একটি যৌথ বাহিনী গঠন করে। সেইসময় যুদ্ধকালীন মুক্তিবাহিনী সহায়তাকারী ভারতীয় বাহিনীকে " মিত্র বাহিনী" বলা হত। ৩রা ডিসেম্বর পাকিস্তানি বিমান বাহিনী ভারতের কয়েকটি বিমান ঘাঁটিতে হামলা চালালে শুরু হয় সর্বাত্মক যুদ্ধ।

যৌথ বাহিনীর অধীনে বাংলাদেশ সীমান্তে এ সময় আক্রমণ শুরু হয়। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সময় চালানো হয় বিমান হামলা । হয় ডিসেম্বর ভারত সর্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে সর্বপ্রথম স্বীকৃতি দেয় । ৮ থেকে ৯ ডিসেম্বরের মধ্যে কুমিল্লা , ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নোয়াখালী শহর যৌথ বাহিনীর দখলে আসে।১০ ডিসেম্বর হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টাল নিরপেক্ষ এলাকা ঘোষণা করে ঢাকায় থাকা কূটনীতিক ও বিদেশী নাগরিকদের সেখানে আশ্রয় দেওয়া হয়।

ঐদিন বিশেষ বিমান যোগে ঢাকা থেকে ব্রিটিশ ও অন্যান্য বিদেশি নাগরিকদের দের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। ১১ থেকে ১২ ডিসেম্বরের মধ্যে ময়মনসিংহ , হিলি, কুষ্টিয়া, খুলনা, রংপুর , রাজশাহী , দিনাজপুর ও সিরাজগঞ্জ মুক্তো হয়। ১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে ঢাকা ছেড়ে দেশের অন্যত্র বড় শহর ও সেনানিবাসে পাকিস্তানি বাহিনীরা আত্মসমর্পণ করে, ওই দিনই পাকিস্তানী বাহিনীর যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। আত্মসমর্থনের সুবিধার্থে মিত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল স্যাম মানেকশের আহবানে উভয়পক্ষ ১৬ ই ডিসেম্বর বিকালে তিন তিনটায় যুদ্ধ বিরতিতে সম্মত হয়।

পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ

আসুন এবার জেনে নেওয়া যাক কিভাবে মুক্তিবাহিনী আত্মসমর্পণ করে বাঙ্গালীদের কাছে ।বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয় ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ এর মধ্য দিয়ে। ঐদিন হানাদার বাহিনী তাদের শোচনীয় পরাজয় মেনে নিয়ে মুক্তিবাহিনী ও মৃত্যু বাহিনী নিয়ে গঠিত যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং আমরা লাভ করি প্রিয় মাতৃভূমি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

আরো পডুনঃ কবে থেকে ২৬ শে মার্চ কে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের নেতৃত্ব দেন যৌথ বাহিনীর কমান্ডার লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। তার সঙ্গে ছিলেন মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধি মুক্তিবাহিনীর উপপ্রধান সেনাপতি গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ. কে. খন্দকার। আত্মসমর্পণের দৃশ্য দেখার জন্য রেসকোর্স ময়দানে লোকের লোকারণ্য হয়ে যায় ।জয় বাংলা স্লোগানে ঢাকার আকাশ বাতাস মুখরিত হতে থাকে। ঢাকার স্পোর্টস ময়দানে খোলা আকাশের নিচে একটি টেবিলে বসে যৌথ বাহিনীর পক্ষে লে. ক জেনারেল আরোরা এবং পরাজিত পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে লে. জেনারেল এ. এ কি মিয়াজী আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেন ।বন্দী করা হয় পাকিস্তানি প্রায় ৫৩ হাজার সৈন্যকে।

এভাবে আমাদের মুক্তিবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ লড়াই, সমগ্র বাঙালি জাতির স্বাধীনতার জন্য তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও দৃঢ় ঐক্য , মিত্রবাহিনীর সক্রিয় সহায়তা এবং বিশ্ব জনমতের সমর্থনে প্রায় নয় মাসে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সফল সমাপ্তিতে পৌঁছে। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা লাভ করতে পারি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বাধিনায়ক কে ছিলেন

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়, জেনারেল এম. এ. জি ওসমানী ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের  সর্বাধিনায়ক। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন সশস্ত্র বাহিনীর সেনাপতি।

কাদের মুক্তিযোদ্ধা বলা হয়

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি শাসক বাহিনীর হাত থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। কে যুদ্ধে সরাসরি যারা অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদেরকে মুক্তিযোদ্ধা বলা হয়। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করা ছাড়াও যারা মুক্তিযোদ্ধাদের সেবামূলক কাজে অংশগ্রহণ করেছিল তাদেরকেও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য করা হয়। এমনকি ভারতীয় শরণার্থী শিবিরগুলোতে যারা খাদ্য বিতরণ করেছিল তাদের কেউ মুক্তিযোদ্ধা উপাধি দেওয়া হয়।

প্রথম নারী মুক্তিযোদ্ধার নাম

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পুরুষদের সাথে অনেক নারী ও অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী প্রথম নারী হলেন-ড. ক্যাপ্টেন সিতারা রহমান। মুক্তিযুদ্ধের বিশেষ অবদানের কারণে তাকে বীর প্রতীক উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। সৈন্য দিয়ে সাহায্য করা ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণে ভারতের অবদান অপরিসীম। ভারত সরকার ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো হত্যার নিন্দা করতে শুরু করে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানের অজুহাতে তখন যে গণহত্যা শুরু হয়েছিল, ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তা প্রতিহত করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি এই উদ্দেশ্যে প্রায় তিন সপ্তাহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। 

তার সাথে বিভিন্ন মন্ত্রী, নেতা ও নেতাকর্মীরাও বিদেশ সফর করে বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনম ত গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এছাড়াও গণহত্যার হাত থেকে বাঁচতে সীমান্ত পেরিয়ে আসা প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে ভারত আশ্রয় দেয় এবং তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয়। ভারতের মাটিতে বাঙালি যুবকদের সশস্ত্র ট্রেনিং  থাকে।

পরিশেষে বলতে হয়,অনেক ত্যাগ তিতিক্ষা, অনেক প্রাণের বিনিময়ে , অগণিত মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এই স্বাধীনতা। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে আমরা নিজেরা জানবো এবং মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে জানতে সাহায্য করবে। আশা করছি এই পোষ্টের মাধ্যমে আমি আপনাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে জানাতে পেরেছি এবং মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জেনে আপনিও উপকৃত হয়েছেন।







এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন

comment url